ENGLISH ঢাকাঃ মঙ্গলবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১১:২৭

প্রকাশিত : বুধবার, ০৭ মার্চ ২০১৮ ০৩:৪৬:৫৮ অপরাহ্ন Zoom In Zoom Out No icon

ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা অবিস্মরণীয় গৌরবের এক অনন্য দিন আজ

দ্যা ডেইলি ডন

আজ ঐতিহাসিক ৭ মার্চ। ১৯৭১ সালের এই দিনে ঢাকার ঐতিহাসিক রেসকোর্সের ময়দানে পূর্ব বাংলার নিপীড়িত মানুষের মুক্তির বাণী ঘোষণা করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বঙ্গবন্ধুর সেই জ্বালাময়ী ভাষণের ‘এবারের সংগ্রাম, আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম, আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম’ এই মহান উচ্চারণের মধ্যেই ঘোষিত হয়ে গিয়েছিল জাতির মুক্তির পথ।

রোমান নেতা জুলিয়াস সিজারের মৃত্যুর পর মার্ক এন্টনির ভাষণ, আমেরিকার প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকনের গেটিসবার্গ ভাষণের চেয়েও ৭ মার্চের  বঙ্গবন্ধুর ভাষণ বেশি গুরুত্ববাহী ও হৃদয়গ্রাহী। মহাকাব্যিক দ্যোতনায় সেদিন ধ্বনিত হয়েছিল জাতির মুক্তির সনদ। ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণকে বিশ্ব প্রামাণ্য ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেয় জাতিসংঘের শিক্ষা বিজ্ঞান ও সাংস্কৃতিক বিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কো। এটি আমাদের গৌরবময় জাতীয় অর্জন।

১৯৪৭ সালের দেশ বিভাগের পর পাকিস্তানের জন্মলগ্ন থেকেই পূর্ব বাংলার মানুষ শোষণ ও নিপীড়নের শিকার হচ্ছিল। পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী বাংলাকে তাদের নয়া উপনিবেশে পরিণত করতে সচেষ্ট ছিল প্রথম থেকেই। তারা একের পর এক বাঙালির ভাষা, সংস্কৃতি, অর্থনীতিসহ সব ন্যায্য অধিকারের ওপর আঘাত হানছিল। পূর্ব বাংলাকে শোষণ করে পশ্চিম পাকিস্তান অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ হচ্ছিল। চাকরি, শিক্ষা, ক্রীড়া সব দিক থেকেই বৈষম্যমূলক আচরণ করা হচ্ছিল বাঙালি জাতির সঙ্গে। যদিও পাকিস্তানে বাঙালিরাই ছিল সংখ্যাগুরু; তবু সংখ্যালঘু পাঞ্জাবি ও অন্য অবাঙালি শাসকরা কুক্ষিগত করে রেখেছিল সব ক্ষমতা। ১৯৪৭ থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে প্রতিবাদ, বিক্ষোভ, আন্দোলন করেছে পূর্ব বাংলার মানুষ। এভাবে ধীরে ধীরে চূড়ান্ত মুক্তিযুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়েছে জাতি। সশস্ত্র সংগ্রাম ছাড়া স্বাধীনতার কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছার আর কোনো পথ নেই এ কথা স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল সবার কাছেই। ১৯৭০ সালের জাতীয় পরিষদের সাধারণ নির্বাচন বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে পূর্ব বাংলার মানুষের মুখপাত্র আওয়ামী লীগ। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার ন্যায্য দাবিদার হন বঙ্গবন্ধু। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানি সামরিক জান্তা ও তার সহযোগী পিপিপি প্রধান জুলফিকার আলি ভুট্টো ষড়যন্ত্র করেন যে, কিছুতেই বাঙালির হাতে শাসনভার দেওয়া চলবে না। এই ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে ১৯৭১ সালে নতুনভাবে শুরু হয় গণআন্দোলন। ৩ মার্চেই বঙ্গবন্ধু ঘোষণা করেন যে, ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে গণজমায়েত হবে।

৭ মার্চ গণসমুদ্রে পরিণত হয় বিশাল রেসকোর্স ময়দান। ঢাকার মানুষ তো বটেই, পূর্ব বাংলার প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকেও এই জনসমাবেশে অংশ নিতে হাজির হয় জনতা। প্রাণপ্রিয় নেতার নিজের মুখে তারা শুনতে চায় চূড়ান্ত নির্দেশ। বঙ্গবন্ধু যখন মঞ্চে উঠে দাঁড়ান, তখন উত্তাল জনসমুদ্র স্তব্ধ হয়ে অপেক্ষায় তাকিয়ে থাকে তার দিকে। সেদিন বঙ্গবন্ধু কোনো লিখিত ভাষণ পাঠ করেননি। পাঠ করেননি চিরাচরিত কোনো বক্তৃতা। সেই দিন সেই ক্ষণে যেন তার কণ্ঠে উচ্চারিত হয় বাঙালির প্রাণের দাবি। তিনি বজ্র নির্ঘোষে উচ্চারণ করেন, ‘আর যদি একটা গুলি চলে, যদি আমার লোকদের হত্যা করা হয়, তা হলে আপনাদের কাছে আমার অনুরোধ রইল- বাংলার প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তুলো, যার যা আছে তা-ই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করতে হবে।’ বস্তুত এই ভাষণের মধ্যেই বঙ্গবন্ধু সশস্ত্র যুদ্ধের নির্দেশনা দিয়ে দেন। তিনি আশঙ্কা করছিলেন, সামরিক জান্তা তাকে হয়তো অচিরেই গ্রেপ্তার করবে বা হত্যা করবে। তাই তিনি বলেন, ‘আমি যদি হুকুম দিবার না-ও পারি...’। তিনি প্রকৃতপক্ষে তখনই স্বাধীনতার জন্য জাতিকে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার আহ্বান জানান। ‘আমরা ওদের ভাতে মারব, পানিতে মারব। সাড়ে সাত কোটি মানুষকে দাবায়ে রাখতে পারবা না, আমরা মরতে শিখেছি, কেউ আমাদের আটকাতে পারবে না।’ বঙ্গবন্ধুর এ কথা অক্ষরে অক্ষরে সত্য হয়েছিল একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে। বীর বাঙালি তাদের প্রিয় নেতার আদেশকে বুকে নিয়ে অস্ত্র হাতে মোকাবিলা করেছিল চরম শত্রুর। বাংলার মাটি যে সত্যিই দুর্জয় ঘাঁটি, তা ৯ মাসের মুক্তিযুদ্ধে হাড়ে হাড়ে বুঝে নিয়েছিল পাকিস্তানি হানাদার শত্রু।

২৫ মার্চের ভয়াল গণহত্যার পর ২৬ মার্চের প্রথম লগ্নে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণার পর যে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়, তার প্রকৃত প্রারম্ভ ছিল ৭ মার্চে।

জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর বজ্রকণ্ঠের সেই ঘোষণা, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম’ই ছিল প্রকৃতপক্ষে বাঙালি জাতির জন্য স্বাধীনতার অমোঘ ঘোষণা।

বাঙালির ইতিহাসে, বিশ্বের ইতিহাসে এমন মহাকাব্য আর কেউ কোনো দিন উচ্চারণ করতে পারেননি, হয়ত আর কখনো কারও পক্ষে এমন উচ্চারণ করা সম্ভবও হবে না।

আরো খবর

    ট্যাগ নিউজ