ENGLISH ঢাকাঃ বৃহস্পতিবার, ১৫ নভেম্বর ২০১৮, ০৫:৪৮

প্রকাশিত : শনিবার, ০৩ নভেম্বর ২০১৮ ০৪:০৬:৪৬ অপরাহ্ন Zoom In Zoom Out No icon

পৃথিবীর ইতিহাসে নজিরবিহীন হত্যাকাণ্ড

দ্যা ডেইলি ডন

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সপরিবারে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যাকাণ্ডের পর এক অনিশ্চিত গন্তব্যে ছিল বাংলাদেশ। সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যকাণ্ডের পর রাষ্ট্র ও রাজনীতির কাঠামো যখন নড়বড়ে অবস্থা ঠিক সে সময় জাতীয় চার নেতাকে আটক করে কারাগারে পাঠান বিশ্বাস ঘাতক খন্দকার মোশতাক আহমেদ। তবে ‘খুনিদের হাত থেকে বাঁচাতেই চার নেতাকে কারাগারে আটক রাখা হয়েছে’ এমন কথা প্রচার করতেন মোশতাক।

কারাগারে এই চার নেতাকে আটক রেখে  মোশতাক সরকারে প্রতিনিধিত্ব করতে প্রতিনিয়ত প্রস্তাব রাখা হতো। কিন্তু মোশতাকে এই প্রস্তাব তারা বার বারই ফিরিয়ে দিতেন। নিশ্চিত মৃত্যু জেনেও তারা সে সময় বঙ্গবন্ধুর রক্তের সঙ্গে বেইমানি করেননি। বুকের রক্ত দিয়েই বিশ্বাসঘাতকদের সেদিনের প্রস্তাবের জবাব দিয়েছিলেন তারা।

স্বপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে নির্মমভাবে হত্যার পর একই বছরের ৩ নভেম্বর মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম বীর সেনানী ও চার জাতীয় নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দিন আহমেদ, এএইচএম কামারুজ্জামান এবং ক্যাপ্টেন মনসুর আলীকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের নির্জন প্রকোষ্ঠে নির্মম ও নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। কারাগারের মতো নিরাপদ জায়গায় এমন বর্বর হত্যাকাণ্ড পৃথিবীর ইতিহাসে নজিরবিহীন। 

এ নির্মম ও বর্বরোচিত ঘটনার পরদিন তৎকালীন উপ কারা মহাপরিদর্শক (ডিআইজি প্রিজন) কাজী আবদুল আউয়াল লালবাগ থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। কিন্তু দীর্ঘ ২১ বছর এ মামলার বিচার প্রক্রিয়াকে ধামাচাপা দিয়ে রাখা হয়। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে মামলাটি পুনরুজ্জীবিত করে বিচার প্রক্রিয়া শুরু করে। 

২ বছর তদন্ত শেষে তদন্তকারী কর্মকর্তা সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার আবদুল কাহ্হার আকন্দ ১৯৯৮ সালের ২০ অক্টোবর ২০ জনকে আসামি করে আদালতে চার্জশিট দাখিল করেন। এরপর  ২০০৪ সালের ২০ অক্টোবর ঢাকা মহানগর দায়রা জজ মো. মতিউর রহমান মামলায় রায় দেন। রায়ে তিনজনের মৃত্যদণ্ড ও ১২ জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। 

মৃত্যদণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন- রিসালদার মোসলেম উদ্দিন (পলাতক), দফাদার মারফত আলী শাহ (পলাতক) ও এল ডি (দফাদার) আবুল হাসেম মৃধাকে (পলাতক) মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। এছাড়া বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত চার আসামি সেনা কর্মকর্তা সৈয়দ ফারুক রহমান, সুলতান শাহরিয়ার রশিদ খান, বজলুল হুদা ও এ কে এম মহিউদ্দিন আহমেদসহ ১২ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়। খালাস দেয়া হয় সাবেক মন্ত্রী কে এম ওবায়দুর রহমান, শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন, নুরুল ইসলাম মঞ্জুর ও তাহের উদ্দিন ঠাকুরকে। 

বিচারিক আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল হলে হাইকোর্ট ২০০৮ সালে দেয়া রায়ে মোসলেমের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন। তবে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দুই আসামি মারফত আলী ও হাসেম মৃধাকে খালাস দেন। এছাড়া যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত ফারুক, শাহরিয়ার রশিদ, বজলুল হুদা ও এ কে এম মহিউদ্দিন আহমেদকেও খালাস দেন হাইকোর্ট। তবে ২০১০ সালের ২৭ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার আসামি হিসেবে এ চারজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।

হাইকোর্টের ওই রায়ের বিরুদ্ধে ২০০৯ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর আপিলের আবেদন (লিভ টু আপিল) করে সরকার। ২০১১ সালের ১১ জানুয়ারি আপিল বিভাগ সরকার পক্ষের আপিল আবেদন মঞ্জুর করে আদেশ দেন। আদেশে নিম্ন আদালতে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত তবে হাইকোর্টের রায়ে খালাস পাওয়া দফাদার মারফত আলী শাহ ও এল ডি (দফাদার) আবুল হাসেম মৃধাকে অবিলম্বে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেয়া হয়। আত্মসমর্পণ না করলে তাদের গ্রেফতার করতে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে নির্দেশ দেয়া হয়।

২০১৩ সালের ৩০ এপ্রিল ওই আপিলের ওপর রায় দেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। রায়ে জেলখানায় জাতীয় চার নেতা হত্যা মামলায় বহিষ্কৃত দুই সেনা সদস্য দফাদার আবুল হাসেম মৃধা ও দফাদার মারফত আলী শাহকে নিম্ন আদালতের দেয়া মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখা হয়। একই সঙ্গে তাদের খালাস দেয়া সংক্রান্ত হাইকোর্টের রায় বাতিল ঘোষণা করা হয়। আবুল হাসেম ও মারফত আলী দু’জনই সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার দায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামি।

২০১৫ সালের ১ ডিসেম্বর ওই রায়ের ২৩৫ পৃষ্ঠার অনুলিপি প্রকাশ পায়।

বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানার লেখা ওই রায়ে বলা হয়, ‘এ মামলায় পর্যাপ্ত প্রমাণ রয়েছে যে, ২ নভেম্বর রাতে রিসালদার মোসলেম উদ্দিনের সঙ্গে এ দুই আসামি কারাগারে ঢুকেছিলেন। তাদের সঙ্গে আরও দুই সামরিক বাহিনীর লোক ছিল। তারা তাদের আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে আওয়ামী লীগের চার নেতাকে হত্যা করে। হাইকোর্ট বিভাগ এ দুই অভিযুক্তকে নির্দোষ দেখিয়ে ভুল এবং অবিচার করেছে।’

জাতীয় জেল হত্যা দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ-সংগঠনগুলো বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জেল হত্যা দিবস উপলক্ষে পৃথক বাণী দিয়েছেন। বিবৃতিতে তারা শহীদ জাতীয় চার নেতার স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান।

জেল হত্যা দিবস উপলক্ষে আওয়ামী লীগ বিস্তারিত কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। সকাল ৬টায় বঙ্গবন্ধু ভবন ও দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়সহ দেশের সর্বত্র শাখা কার্যালয়ে জাতীয় ও দলীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা, কালো ব্যাজ ধারণ ও কালো পতাকা উত্তোলন। সকাল ৭টায় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ। সকাল ৮টায় বনানী কবরস্থানে ১৫ আগস্টের শহীদ ও জাতীয় নেতাদের কবরে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ। সকাল সাড়ে ৯টায় পুরাতন জেলখানায় যেখানে চারনেতা নিহত হয়েছিলেন সেই কক্ষে এক মিলাদ মাহফিল। রাজশাহীতে জাতীয় নেতা শহীদ কামরুজ্জামানের কবরে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ। বিকাল ৩টায় রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে স্মরণসভা অনুষ্ঠিত হবে। এতে সভাপতিত্ব করবেন প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা।

এছাড়া স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের ধানমন্ডির বাসভবনে বাদ মাগরিব-শহীদ এম মনসুর আলীসহ জাতীয় চার নেতার রুহের মাগফেরাত কামনায় মিলাদ-মাহফিল ও দোয়া অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে।

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এক বিবৃতিতে আওয়ামী লীগের সকল জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন শাখা এবং সকল সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের নেতা-কর্মী-সমর্থক-শুভানুধ্যায়ী এবং সর্বস্তরের জনগণকে দিবসটি যথাযথ মর্যাদা ও শোকাবহ পরিবেশে পালনের আহ্বান জানিয়েছেন।

আরো খবর

    ট্যাগ নিউজ

    সর্বশেষ খবর