ENGLISH ঢাকাঃ মঙ্গলবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১১:১২

প্রকাশিত : সোমবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০১৮ ০৩:২৯:০৫ অপরাহ্ন Zoom In Zoom Out No icon

নামি-দামি হাসপাতালে মেয়াদোত্তীর্ণ বিদেশি ওষুধ

দ্যা ডেইলি ডন

দীর্ঘদিন ধরে ঢাকার নামিদামি হাসপাতালগুলোতে ভারত থেকে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ এনে প্যাকেটজাত করে সরবরাহ করা হচ্ছে । আকাশ পথে আসা মেয়াদোত্তীর্ণ এসব ওষুধ দেশে আসার ক্ষেত্রে প্রতিটি ধাপে চলছে ঘুষ লেনদেন। জয়েন্ট কমিশনার থেকে পিয়ন পর্যন্ত উৎকাচ লেনদেনের প্রমাণপত্র পেয়েছে র্যাব। এ ক্ষেত্রে ১ লাখ টাকা থেকে ৫শ’ টাকা পর্যন্ত ঘুষ লেনদেন হচ্ছে। 

ইতিমধ্যে এপোলো হাসপাতালে এসব ওষুধ সরবরাহের নথিসহ প্রমাণ জব্দ করেছে র্যাব। পুরো বিষয়টি শীর্ষ প্রশাসনকে অবহিত করা হয়েছে। পরে শীর্ষ প্রশাসন থেকে কঠোর পদক্ষেপ নিতে র্যাবকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পরে ঘটনার সঙ্গে জড়িত পলি ফার্মার মালিক দেলোয়ার হোসেনের বিরুদ্ধে বিশেষ ক্ষমতাবলে মামলা দায়ের করেছে র্যাব।  ক্ষিলক্ষেত থানায় মামলা নং-৭, তারিখ ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৮। মামলার বাদি র্যাব-১ উত্তরার জেসিও মো. আরশাদুর রহমান।

জানা গেছে, ওষুধ প্রশাসন অধিফতরের কোন অনুমতি নেই পলি ফার্মার। তারা ভারত থেকে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ এনে নতুন করে ইচ্ছা মতো মেয়াদ বর্ধিত করে মেকি সীল বানিয়ে মোড়ক ও লেভেলে তা বসিয়ে দিত। এরপর ওই ওষুধ সরবরাহ করা হতো এপোলোসহ রাজধানীর নামিদামি হাসপাতালগুলোতে। ভারত থেকে আনা এমন ৩৪টি ওষুধ জব্দ করেছে র্যাব। ২০১২ সাল থেকে এমন মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ এপোলো হাসপাতালে সরবরাহ করা হচ্ছে। গোপন তথ্যের ভিত্তিতে র্যাব গত দুই বছর ধরে বিষয়টি পর্যবেক্ষণ ও তদন্ত করে আসছে। গত ১৯ ফেব্রুয়ারি এপোলো হাসপাতালে এমন মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুষের নথিসহ প্রমাণ জব্দ করা হয়। মেয়াদ উত্তীর্ণ ওষুধ ও রি-এজেন্ট রাখার অভিযোগে রাজধানীর এপোলো হাসপাতালকে ৫ লাখ টাকা জরিমানা করেছে র্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত। বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় অবস্থিত এই হাসপাতালটিতে সোমবার সকাল ১১টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত র্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান চালায়।  এ সময় ওষুধ প্রশাসন অধিদফতরের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। অভিযান পরিচালনাকালে ভ্রাম্যমাণ আদালত দেখতে পান এপোলো হাসপাতালের নিজস্ব ফার্মেসিতে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ ও রি-এজেন্ট মজুদ করা আছে। অথচ এই ওষুধ ওই হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীদের চিকিত্সকের ব্যবস্থাপত্র অনুযায়ী এসব ওষুধ ব্যবহার করা হচ্ছিল। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন-২০০৯ এর ৫২ ও ৫৩ এবং দি ড্রাগ এ্যাক্ট-১৯৪০ এর ১৮ ও ২৭ ধারা মোতাবেক মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ মজুদ ও বিক্রয় এবং মেয়াদ উত্তীর্ণ রি-এজেন্ট (বিকারক) দ্বারা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার অপরাধে এপোলো হাসপাতাল ও তাদের নিজস্ব ফার্মেসিকে ৫ লাখ টাকা জরিমানা করে ভ্রাম্যমাণ আদালত। বিশেষ ক্ষমতা আইনের মামলায় এখন কারাবন্দি দেলোয়ারের দেওয়া তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও ওষুধ প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে এপোলো হাসপাতালে অভিযানে যাওয়া হয় বলে জানান ম্যাজিস্ট্রেট সারোয়ার আলম। হাসপাতালের ফার্মেসি থেকে ৩০ আইটেমের তিন কার্টন ওষুধ জব্দ করা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, এর মধ্যে ক্যান্সার, হূদরোগসহ বিভিন্ন রোগের ওষুধ রয়েছে। নকল ওষুধের দাম হিসেবে দেলোয়ার এখনও এপোলো হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে সাত লাখ টাকা পাবেন বলে জানান তিনি।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ দেশে এনে সরবরাহ করার ক্ষেত্রে একটি সিন্ডিকেট তৈরি হয়েছে। ঘুষ লেনদেনও হচ্ছে ব্যাংকে। রাজধানীর নামিদামি হাসপাতালগুলোর চাহিদা অনুযায়ী মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ সরবরাহ করতো পলি ফার্মা। এক্ষেত্রে র্যাবের অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে মিউচ্যুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের উত্তরা শাখার ০০৭০২০০০৮৫৮২ এবং ০০৭০১৫৯০০০১৯৭ এই দুই অ্যাকাউন্ট নম্বরে এপোলো হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ওষুধের বিল পরিশোধ করতেন। এ দুই অ্যাকাউন্টে কয়েক কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে তথ্য পাওয়া গেছে। র্যাবের পক্ষ থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকে ওই দুই অ্যাকাউন্টে লেনদেনের পরিমাণের তথ্য চাওয়া হয়েছে।  অ্যাকাউন্টের মালিক মো. দেলোয়ার হোসেন। কোন কোন ক্ষেত্রে পূর্বালী ব্যাংকেও ঘুষ লেনদেন হওয়ার প্রমাণ পেয়েছে র্যাব। এ ব্যাপারে ওষুধ প্রশাসন অধিদফতরের কর্মকর্তারা জানান, ভারত থেকে ওষুধ আমদানির কোন অনুমতি পলি ফার্মার নেই। পলি ফার্মার মালিকের বাড়িই হলো ওষুধের কারখানা। ওই কারখানায় অভিযান চালিয়ে রাজধানীর আরো দুটি নামিদামি হাসপাতালের মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ সরবরাহের ফাইল জব্দ করেছে র্যাব। পরে ওই দুটি হাসপাতালে পর্যবেক্ষণ ও ব্যাপক খোঁজ-খবর নেওয়া হচ্ছে। এদিকে গ্রেফতার মো. দেলোয়ার হোসেনকে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদে তিনি আরো স্বীকার করেন যে, তার মালিকাধীন পলি ফার্মা নামক প্রতিষ্ঠানের ছদ্মাবরণে উক্ত অবৈধ ব্যবসা ২০১২ সাল থেকে করে আসছেন।

হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রায়ই মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে আনা ওষুধ আটক করা হচ্ছে। ২৩ অক্টোবর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের এয়ারফ্রেইট এলাকা থেকে মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে অবৈধভাবে আমদানিকৃত ৩০ লাখ টাকা মূল্যের ওষুধ আটক করেন শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতরের কর্মকর্তারা। বিমান বন্দরের কাস্টমসের এক শ্রেণির কর্মকর্তা দেলোয়ার হোসেনের মতো ওষুধ চোরাচালানীদের ওষুধসহ বিভিন্ন পণ্য সামগ্রী পাচারে সহায়তা করে আসছেন। আরও উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, এসব ওষুধ বাংলাদেশে আমদানি ও ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে মেয়াদোত্তীর্ণ ও অবৈধ ওষুধ বিক্রি প্রতিরোধে মাঠে নামে ভ্রাম্যমাণ আদালত। অভিযান চালানো হয় পুরনো ঢাকার বিভিন্ন মার্কেটে। এ সময় মেয়াদোত্তীর্ণ ও অবৈধ ওষুধ বিক্রির দায়ে ২৪টি ওষুধের দোকান সিলগালা করে দেয়া হয়। জরিমানা করা হয় ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা। অভিযানে জব্দ করা হয় প্রায় ৫ কোটি টাকার ওষুধ। আদালত ২০ জন অসাধু ব্যবসায়ীকে এক বছর করে কারাদণ্ডও প্রদান করেন। এছাড়া সাতক্ষীরার ভোমরা বন্দরে পেঁয়াজের এলসিতে ২ কোটি টাকার অবৈধ ওষুধ আমদানির ঘটনায় সারা দেশে তোলপাড় শুরু হয়। গত বছর ২০ এপ্রিল ভোমরা বিজিবি ক্যাম্পের ২০০ গজ দূরে একটি গোডাউনে রক্ষিত প্রায় ১০ হাজার কেজি পেঁয়াজের মধ্য থেকে ম্যাজিস্ট্রেট রিজাউল করিমের নেতৃত্বে টাস্কফোর্সের একটি দল অভিযান চালিয়ে ১ কোটি ৯৪ লাখ ১৩ হাজার ১২০ টাকা মূল্যের আমদানি নিষিদ্ধ ভারতীয় অবৈধ ওষুধ উদ্ধার করে।

জানা গেছে, বাজারে প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকার ওষুধের এক-দশমাংশই নিম্নমানের। দেশের অতিলোভী একশ্রেণির চিকিত্সকের ব্যবস্থাপত্রের সুবাদে এসব ওষুধের চাহিদা ও বিপণন ক্রমেই বাড়ছে। আর চাহিদা অনুযায়ী আকাশ, বাস ও রেল পথে ভারত থেকে আনা হচ্ছে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ। সংশ্লিষ্ট পৃথক সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, শুধু রাজধানীতেই প্রায় দেড় শতাধিক ভুঁইফোড় প্রতিষ্ঠান ভেজাল ওষুধ তৈরি ও নিষিদ্ধ-মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ আমদানির সঙ্গে জড়িত।

আরো খবর

    ট্যাগ নিউজ