ENGLISH ঢাকাঃ শুক্রবার, ২৩ ফেব্রুয়ারী ২০১৮, ০৮:৩৮

প্রকাশিত : সোমবার, ০৮ জানুয়ারী ২০১৮ ০৫:৫৩:২৪ অপরাহ্ন Zoom In Zoom Out No icon

মেঘ বাড়ি

দ্যা ডেইলি ডন
মিতা আলী

মেয়েদের কোন বাড়ি নেই। প্রথমে বাপের বাড়ি, তারপর স্বামীর বাড়ি এবং সবশেষ ছেলের বাড়িই তাদের বাড়ি। তবে স্থানান্তর হলেও বাপের বাড়ির স্মৃতি মেয়েরা কখনোই ভুলতে পারে না। তার জন্ম, শৈশব, কৈশোরের স্মৃতিমাখা বাপের বাড়ির ঠিকানাটাই মেয়েদের আসল ঠিকানা। আজ আমার এ ধারণাটা আরো দৃঢ়তর মনে হলো। কেননা প্রকৃতিও তাই বলে। মেঘে মেঘে ছড়াছড়ি, হুড়োহুড়ি, লুটোপুটি, কাটাকাটি। একজন দৌড়ে এখানে যায় তো বাকীরা দৌড়ায় পেছনে। সেটা পাহাড়ের মাথায় নাকি সাত পাহাড়ের বুকে কে তার হিসেব মেলাবে। আমি বলছি শিলং-এর কথা। সেভেন সিস্টার খ্যাত ভারতের উত্তর পূর্ব অঞ্চলের একটি অন্যতম একটি সুন্দর রাজ্য মেঘালয়। শিলং হলো পূর্ব খাসি পাহাড় জেলার একটি শহর। এটি মেঘালয় রাজ্যের রাজধানীও। শিলং বাংলাদেশ-ভারত তামাবিল সীমান্ত থেকে প্রায় ৬৫ কি.মি. উত্তরে এবং ভুটান-ভারত সীমান্তের প্রায় ১০০ কি.মি. দক্ষিণে অবস্থিত। এটি খাসি পাহাড়ে প্রায় ১৫০০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত একটি শহর। এখানে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়। এখানে রয়েছে পাইন অরণ্য, জলপ্রপাত এবং পার্বত্য জলধারার সমারোহ। শহরের চারপাশে ঘুর্ণায়মান পর্বতমালা ইউরোপের স্কটল্যাণ্ডের কথা মনে করিয়ে দেয়। এজন্য একসময় শিলং "Scotland of the East"  বলে পরিচিত ছিল। ভারতের অন্যতম পর্যটন শহর শিলং। কেউ কেউ বলেন, দার্জিলিং যদি হয় রূপের রানী তা হলে শিলং হচ্ছে রাজা। গত দূর্গা পুজার ছুটিতে আমরা দুই পরিবার শিলং বেড়াতে গিয়েছিলাম। আমাদের দলে চারজন গৃহকর্তা ও কত্রীছাড়াও ছিল দুই পরিবারের তিনটি পরী- শেহরীণ, মারিহা আর নাজিহা। সাথে ১৭ বছরের নটরডেম কলেজে উচ্চ মাধ্যমিকে পড়ুয়া আমার দায়িত্বান বাপজান সামিন।

ঢাকা থেকে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বিলাসবহুল বাসে রাত ১২ টায় সিলেটের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু। প্রায় ছয় ঘন্টা যাত্রা শেষে সকালের অরুনাভ ভোরে পূন্যভূমি সিলেটে এসে দু’ঘন্টা যাত্রা বিরতি শেষে মাইক্রোবাসে করে তামাবিল সীমান্ত অভিমূখে যাত্রা। সিলেট থেকে তামাবিল পর্যন্ত বেহাল রাস্তা। তবে ভ্রমনসঙ্গী দেবদূত শিশুদের কলকাকলি, তাদের নানা রকমের বায়না আর হাজারো প্রশ্ন ইত্যাদি কারণে যাত্রা পথের কষ্ট আমাদের স্পর্শ করতে পারেনি। সিলেট থেকে তামাবিলে সীমান্তে আসার পথটা আমার অচেনা নয়, আগেও এসছি জাফলং বেড়াতে। তবে আমাদের সহযাত্রী জাকিয়ার 

এদিকে প্রথম আসা। তাকে পরিচিত এটি ওঠা দেখাচ্ছিলাম। আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি দু’ধারের মোহময় প্রকৃতি যে কাউকে টানবেই। প্রকৃতি তার অপার ঔদার্য ও সবুজ মায়াময় রহস্য দিয়ে নিয়ে যাবে ভাবনার অতলান্তে। আমার ক্ষেত্রেও এর অন্যথা হয়নি; আমিও মায়ার খেলায় ভাসছি। ভ্রমণ দলের সর্ব কনিষ্ঠ তবে সবচেয়ে প্রাণোচ্ছল সদস্য নাজিহা। কাউসার- জাকিয়া দম্পতির ছোট মেয়ে। প্রায় বিরামহীনভাবে ছড়া ও কবিতা আবৃত্তি করে যাচ্ছে এবং ভাঙ্গ ভাঙ্গ সুরে গাণ গাইছে। আমিও তার সাথে গলা মেলালাম “ আহা কি আনন্দ, আকাশে-বাতাসে।” দূর পাহাড়ের গাঁয়ে গাঁয়ে ভেসে বেড়ানো মেঘমালা। এটা কী পাহাড়ের কান্না, নাকী প্রকৃতির অন্য কোনো খেলা? উদাস মনে মুখ দিয়ে সুর বেরিয়ে আসে “তুই ফেলে এসেছিস কারে, মোর মনরে আমার।”

তামাবিলে নেমে বর্ডারের প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষে সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতের ডাউকি চেকপোষ্টে ইমিগ্রেশন এবং অন্যান্য কাজ সেড়ে শিলংয়ের উদ্দেশ্য রওনা করতে করতেই বেলা দ্বিপ্রহর পেড়িয়ে প্রায় বিকাল হয়ে যায়। টাটা সুমো জীপে করে শিলংয়ের উদ্দেশ্যে যাত্রা। ডাউকি থেকে শিলংয়ের দূরত্ব প্রায় ৮০ কি.মি.। ডাউকি ঝুলন্ত ব্রিজে যকন আমদের গাড়ি, তখন সেখান থেকে আমার প্রিয় বাংলাদেশটাকে দেখে নিলাম। গাড়ী সমতল থেকে ক্রমে পাহাড়ের কূল ঘেসে উপর দিকে উঠছে। এক জায়গায় এসে কাউসার (ঢা.বি ইতিহাসের শিক্ষক) তাঁর গুগুল ম্যাপের তথ্য নিয়ে জানালেন আমরা এখন সমভূমি থেকে ৪৯০০ ফিট উপরে। বাংলাদেশে ঘাম ঝড়ানো গরম হলেও যতই আমরা সামনে যাচ্ছি ততই ঠান্ডা আমাদের ঝাপটে ধরছে। আকাশ জুড়ে কালো মেঘের দৌড়ঝাঁপ। কখনো হালকা বৃষ্টি পুরো দল চুপচাপ। আমাদের পরীরা সব ঘুমিয়ে পড়েছে। গাড়ী চলছে সামিন আর জাকিয়া ছবি তোলা ও ভিডিও করায় ব্যস্ত। বিস্তীর্ণ পাহাড়ি মাঠ ও উপত্যকায় সবুজ ঘাস ও নাম না জানা নানা রকমের জংলী ফুল। তার মাঝে পরিত্যক্ত কিছু ঘর-বাড়ি; মনে হচ্ছে ওয়েষ্টার্ণ গল্পের বাস্তব পটভূমি। এখুনি বুঝি ঘোড়ার খুরের শব্দের সাথে গর্জে উঠবে বন্দুক, বারুদের গন্ধ এস আমাদের নাকে ধাক্কা দিবে। সবেমাত্র ওয়েষ্টার্ণ পড়তে শুরু করা সামিনকে একথা বললে সেও আমার সাথে সায় দেয়। বেশ খানিক্ষণ চলার পর একটা ছোট্র শহর মতো পেলাম। চমৎকার পরিপাটি শহরে পাহাড়ের ভাজে ভাজে নির্মিত বাড়িগুলো বেশ ছিমছাম সাজানো-গোছানো। প্রত্যেকটা বাড়ির সামনে ছোট ছোট টবে নানা রংয়ের সব ফুল। পাহাড়ের ভাজে ভাজে বাড়ি-ঘরগুলো। রাস্তার দু’পাশে হরেক রকমের তাজা শাক-সব্জীর ক্ষেত। ইচ্ছে করছিল গাড়ী থামিয়ে কিনে নেই। 

আমরা চলছি পাহাড়ের বুক ছিড়ে তৈরি করা রাস্তা দিয়ে শিলংয়ের দিকে। প্রায় ঘন্টা তিনেক চলার ড্রাইভার জানালো আমরা প্রায় গন্তব্যে এসে গেছি। ততক্ষনে সন্ধ্যাও নেমে এসেছে। সামনে আলো ঝলমলে শহর। সুউচ্চ পাহাড়ের গায়ে গায়ে বাড়ি-ঘরে বৈদ্যুতিক আলোরচ্ছটা এক মোহময় পরিবেশ। দেখতে দেখতে আমরা শিলং পুলিশ বাজারে এসে গেলাম। এটি শিলংয়ের সেন্টার পয়েন্ট- আপাতত আমাদের গন্তব্য। এর মধ্যদিয়ে আগামী পাঁচদিনের জন্য আমরা ভারতের মেঘালয় রাজ্যের মেঘ বাড়ির বাসিন্দা হলাম।

ঢাকা থেকে কোনো হোটেল ঠিক করে যাওয়া হয়নি। গাড়ী ছেড়ে আমাদের এক খাবার হোটেলে রেখে কর্তারা গেলেন থাকার হোটেল ঠিক করতে। কিছুক্ষন পর ফিরে আসলেন, তাদের মুখ কালো, জানালেন পূজার ছুটিতে পর্যটকের সংখ্যা অনেক বেশি হওয়ায় হোটেল পাওয়া যাচ্ছে না। তবে শেষ পর্যন্ত একটা ব্যবস্থা হলো তাও আবার এক রাতের জন্য। তবে হোটেলটি মন্দ না। সুন্দর পরিপাটি কামরা। ভ্রমণক্লান্তিতে অবসন্ন আমরা পুরোদস্তুর একটা নিরবিচ্ছিন্ন ঘুম দিয়ে সকালে উঠলাম। আজকে এ হোটেল ছাড়তে হবে। তাই নাস্তা সেরে আমাদের কর্তা ছিদ্দিক সাহেব এবং কাউসার সাহেব বের হলেন নতুন আবাসনের খোঁজে। প্রায় দুপুরের দিকে ফিরে এস জানালেন নতুন আবাসনের ব্যবস্থা হয়েছে, তবে সেটিও একদিনের জন্য। কাজেই বাক্স পেটরা নিয়ে আবার বের হয়ে পড়লাম। ট্যাক্সিতে করে যাচ্ছি নতুন আবাসন বিষ্ণুপুরে। হালকা বৃষ্টি হচ্ছে। পাহাড়ের গায়ে গায়ে বাড়ি-ঘর, অফিস আদালত, রাস্তাগুলো অসমতল, কখনো পাহাড় বেয়ে উপরে উঠছি, আবার সোজা নীচে নেমে যাচ্ছি। নতুন হোটেলটি যে জায়গায় তা পুরোপুরি আবাসিক এলাকায়। পুলিশ বাজারের মতো জনবহুল নয়। হোটেলের ব্যালকনিতে দাঁড়ালে পাহাড় আর তার গায়ে নির্মিত ইউরোপীয় ধাঁচের বাড়িগুলো যে কাউকে আকষর্ণ করবে। বিশেষ করে পাহাড়ের গায়ে পেজা তুলা সাদৃশ্য সাদা মেঘরাশির সৌন্দর্য বর্ণনাতীত। হোটেল উঠে ঠিক হলো আজ আর কোনো পর্যটন স্পটে যাব না। লাঞ্চ শেষে শপিং এবং আগামী দিনের শিলং সিটি ট্যুরের ব্যবস্থা করা হবে। হলো তাই, শপিং শেষে ডিনার করে হোটেলে ফিরে ঘুম রাজ্যে গমন।  

পরদিন সকালে সরকারি ব্যবস্থাপনায় শিলং সিটি ট্যুরে বের হলাম। রাত থেকেই বৃষ্টি হচ্ছিল। পর্যটন কর্তৃপক্ষের মিনিবাসে করে সকাল পৌনে দশটায় সিটি ট্যুরে বের হলাম। বাসে আমাদের গাইড বিভা নামের এক তরুণী শুরুতে জানালো আমাদের লক্ষ্য আটটি দশর্নীয় স্থান পরিভ্রমণ করা। প্রথমে গেলাম শিলং পিকে। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় সাড়ে ছয় হাজার ফুট উঁচুতে অবস্থিত শিলং পিক। বৃষ্টির বিঘ্ন এবং ট্রাফিক জ্যামের কারণে শহর থেকে ১০কি.মি. দূরের এ স্পটটিতে যেতে সময় লাঘলো প্রায় দু’ঘন্টা। তবে যখন সেখানে পৌঁছালাম মনে হলো এ যেন এক অন্য জগৎ। এতক্ষণ বৃষ্টি হলেও এখন চমৎকার ঝলমলে রোদ। দু’পাশে দুটি ওয়াচ টাওয়ার। এখান থেকে শিলং শহরের পাহাড়ের গাঁয়ে বাড়িগুলো দেখতে ছবির মতো লাগছে। এ এক অপূর্ব দৃশ্য। কুণ্ডুলাকৃতি সাদা মেঘমালা আর রোদের সম্মিলনীতে পুরো শহরটাকে এক স্বর্গীয় মাত্রায় নিয়ে গেছে। প্রচুর পর্যটক এখানে। পিকে আছে হালকা নাস্তার দোকানসহ আরো কিছু দোকান। এখান থেকে আমরা কিনলাম কেবল কয়েকটি ছাতা। 

শিলং পিক দর্শন শেষে আমাদের গাড়ী ঘুরে চললো Lady Hydari Park-এর দিকে। পার্কটি অনেক পুরনো, কিন্তু যতœ আর ভালোবাসায় এখনো সজীব। পার্কটিতে আছে বাচ্চাদের জন্য খেলার নানা সরঞ্জাম। ভেতরে একটা ছোটখাটো চিড়িয়াখানার মতো আছে। ছোটদের বিনোদনের বাড়তি আয়োজন। পুরো পার্কে রয়েছে নানা জাতের ফুল। বৃষ্টি মাথায় নিয়ে প্রায় পুরো পার্কটিই দেখা হলো। এরপর নতুন গন্তব্যের উদ্দেশে আমরা বাসে এসে সবাই সিট নিয়ে বসেছি। কিন্তু দেখা গেলো এক দম্পতি আসেনি। অবশেষে তারা আসলেন; তবে ততক্ষনে আমাদের বিরক্তিকর ২০ মিনিট অপেক্ষা করা হয়ে গেছে। 

এবারের গন্তব্য Cathedral of Mary Help of Christians। এটা শিলং এর সবচেয়ে পুরোনো, আকর্ষণীয় এবং বৃহৎ চার্চ। ঝুমবৃষ্টিতে আমরা চার্চের আঙিনায় নামলাম। বিশাল বিস্তৃত আঙ্গিনা। জায়গায় জায়গায় যীশু খ্রিস্ট ও মাতা মেরীর মূর্তি। চার্চটির স্থাপত্য নির্মণ শৈলী মনোমুগদ্ধকর। মূল চার্চে বিশাল প্রার্থনা গৃহ, সেখানে মাতা মেরী এবং যীশুর বিশাল মূর্তি। কেমন একটা পবিত্র পরিবেশ। চার্চ দর্শনের জন্য নির্ধারিত সময় ছিল ১৫ মিনিট। কিন্তু এখানেও এক জোড়া পর্যটকের অতিরিক্ত দশ মিনিট ব্যয়ের কারণে এবং মুষলধারে বৃষ্টির কারণে একটি স্পট দেখা হলো না আমাদের। আমরা Shillong Golf Course  আরWards Lake  দেখলাম বাসে থেকেই। 

এবার আমাদের গাড়ী যাচ্ছে Elephant Falls এর দিকে। গাড়ী পার্ক করলো নির্ধারিত জায়গায়। ফল্সে ঢোকার পথে সারি সারি দোকান। হরেক-রকমের জিনিসপত্রের পসরা সাজিয়ে বসে আছে দোকানিরা। তবে এতে যেসব পণ্য সাজানো আছে দেখে মনে হলো তার শতকরা ৯০ ভাগই আমাদের শিশু একাডেমির সামনে পাওয়া যায়। দোকানিরা প্রায় সবাই তরুণী ও বয়স্ক মহিলা। দেখলাম ভাড়ায় ছাতা ও রেইন কোট পাওয়া যায়। ফল্সে ঢাকার আগে আমাদের থলেতে রাখা কলা, বিস্কিটের সাথে গরম চা খেয়ে ক্ষুন্নিবৃত্তি নিবারণের ও উষ্ণ হওয়ার চেষ্টা। এরপর চুটলাম সেই হাতি ঝর্ণা দেখতে। প্রচণ্ড বৃষ্টি, কিন্তু তাতে কী? ভ্রমণ পিপাসু মানুষের ঢল থেমে নেই। অন্যান্য স্পটের মতো এখানেও টিকেট। টিকেট কেটে হাজারটা সিড়ি ধরে নিচে নেমে গেলাম। একি সামনে এত বড় ঝর্ণা। হাতির সূড়ের মতো লম্বা এক বিশাল ঝর্ণা। কী তার পানির তোড়। আমার সাথে সাথেই মনে পড়ল মাধবকুন্ড ও সুভলং ঝর্ণার কথা। এলিফেন্ট ফল্সের স্রোত ধারার কাছে আমাদের ঝর্ণা দুটোকে ক্ষীণ রেখাই মনে হবে। এখানে মূলত তিনটি ফল্স। তিনটিতেই পানির এত সুতীব্র গতি যে মনে হয় আচমকা বানের পানিতে বাঁধ ভেঙ্গে গেলে যা হয় ঠিক তেমনি। চোখের সামনে অবিরত ধারা বয়েই চলছে। এ দৃশ্য দেখে আমার মনে পড়ে যায় সুবীর নন্দীর গান- “পাহাড়ের কান্না দেখে তোমরা তাকে ঝর্ণা বল, ঐ পাহাড়টা বোকা বলে, কিছুই বলে না------------------।” এমন দৃশ্য ছেড়ে সহজে যেতে মন চায় না। কিন্তু আমাদের সময় যে বাঁধা। অগত্যা নতুন স্পটের উদ্দেশ্যে যাত্রা। 

এবারের গন্তব্য উমিয়াম লেক। স্থানীয়রা বলে বড়া পানি। এলিফেন্ট ফল্স থেকে বেশ দূরে এটি। বিকালে গড়িয়ে প্রায় সন্ধ্যা এগিয়ে আসছে। সেই সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বৃষ্টি। আমরা যখন স্পটে নামলাম তখন বৃষ্টির তোড়ে সবকিছু স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল না। একদিকে আমরা অন্যদিকে দূরে পাহাড়। মাঝখানে বড় লেক। অথৈ পানিতে হঠাৎ মনে হলো একটা হাঁস ভেসে যাচ্ছে। কিন্তু গাইড বিভা জানালো ওটা একটা স্পীডবোট। আমি বুঝলাম লেক থেকে কতটা উপরে আমরা। ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়। ক্ষুধা আর ক্লন্তিতে অবসন্ন আমরা। পাশেই দেখলাম গরম গরম ভূট্টা, ডিমসিদ্ধ, সব্জী পাকোড়া আর ড্রিংকস। কোনোটাই বাধ রাখিনি চেখে দেখতে। খাওয়া শেষে এবার ফিরে যাওয়ার পালা। অবশেষে পুলিশ বাজার এবং সেখান থেকে সোজা হোটেলে। ক্লান্তিতে সবাই কাবু, কোনো রকমে ডিনার শেষে আবার ঘুম রাজ্যে গমন। সময় স্বল্পতার কারণে আমরা দেখতে পরিনি, তবে শিলংয়ে আরো অনেক দর্শনীয় স্থান রয়েছে। 

এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো- Motphran, Capt. Williamson Sangma State Museum,  Don Bosco Centre for Indigenous Cultures, Entomological Museum Ges Rhino Heritage Museum ইত্যাদি। 

পরের দিন সকালটা খুবই সুন্দর। পাহাড়ের গা থেকে মেঘ সরে যাওয়ায় পরিস্কার দেখা যাচ্ছে সবুজ অরণ্যরাজি। গত দু’দিনে একবারও ঠিক মতো দেখতে পারিনি। এত উঁচু, আসলে আমরাতো ৪৬০০ ফুট উপরে। মনে পড়ছে নেপালের কথা। এত সুন্দর সকালে নেপালের কথা কেন মনে পড়লো? চারদিক ঝকঝকে, রাস্তার কুকুরগুলো বিকটস্বরে চিৎকার করছে।  হোটেলের ব্যালকনীতে দাঁড়িয়ে দেখলাম চমৎকার পরিপাটি বাড়িগুলো। প্রায় প্রতিটি বাড়ির আঙিনায় গাড়ী। ফুলের টব, ছিমছাম গুছানো। প্রাণ-প্রাচুর্য্যে ভরা প্রকৃতির অবদানে পূর্ণ এ জায়গা। 

আজ আমরা চেরাপুঞ্জি যাব। পৃথিবীর সর্বাধিক বৃষ্টিপাতের স্থান চেরাপুঞ্জি। তামাবিল থেকে একেবারেই কাছে মেঘালয় রাজ্যেই এই চেরাপুঞ্জি। শিলং থেকে ৫৬ কিলোমিটার দূরের এই শহরের উচ্চতা ৪,২৬৭ ফুট।  বাংলাদেশ সীমান্ত থেকে চেরাপুঞ্জি সোজাসুজি কুড়ি কিলোমিটারেরও কম। সেভ্রোলেট গাড়িতে করে আমাদের যাত্রা শুরু। ড্রইভার বাপন স্বল্পভাষী মানুষ। ঝিরঝিরে বৃষ্টি হচ্ছে। গাড়ি শহর ছেড়ে ভারতীয় বিমান বাহিনীর ইস্টার্ণ হেড কোয়ার্টার বামে রেখে আাঁকা বাকা পাহাড়ি রাস্তা ধরে এগিয়ে যাচ্ছে। দুধারে অসম্ভব সুন্দর পাহাড়। মাঝে মাঝে ঘন কুয়াশার মতো মেঘে ঢাকা পড়ছে পাহাড়। কখনো চারপাশ থেকে মেঘ আমাদের গাড়িটাকে ঢেকে দিচ্ছে। হাত দিয়ে মেঘ ধরার চেষ্টায় আমরা সবাই উচ্চশিত। যাত্রা পথে আমরা থেমেছিলাম মকডক, এবং থাংকারাং পার্ক। তুলনামূলক নান্দনিক ঝর্ণা ঘিরে নানা স্পট তৈরি করা হয়েছে। আমরা এসব জায়গায় নেমে দেখছি প্রকৃতি কিভাবে অপার আকুল হয়ে ডাকে আমাদের। নিজের মত করে নিজের সৌন্দর্য বিলিয়ে চলা প্রকৃতি যেন আমাদের বলছে- এসো, দেখো, শিখ, কিভাবে নিজেকে ছড়িয়ে দিতে হয় অন্যের মাঝে। ঝর্ণা, পুকুর, মেঘ এবং ফুলরাজি আকাশের কাছাকাছি। প্রেমময় মহাত্মা আমার তোমাকে ছুঁতে ইচ্ছে করছে; বাবা-মা’কে এখানে নিয়ে আসতে ইচ্ছে করছে। সুন্দরীতমা আমার মা যখন আবৃত্তি করতো সঞ্চয়িতা; গভীর রাতে যখন উনার ঘর থেকে হৈমন্তী শুক্লার গান ভেসে আসত আমার সে সময়ের কথা মনে পড়ছে। সামিন প্রকৃতির এ মোহনীয় রূপকে তার ক্যামারাবন্দি করতে ব্যস্ত। আর ছোট্ট পরিমণীদের আনন্দ- ভাষাবন্দির সুযোগ নেই।   একটা জায়গাটার নাম লাবাং। এটাও একটা স্পট। ছোট খাবারের দোকান। ওদের নিজস্ব কিছু জিনিসের দোকান। হঠাৎ তাকিয়ে দেখি পাথরের বিশাল পাহাড়। নিচে সুন্দর ঝিরে ঝিরে ঝর্ণা। পুরো রাস্তা-ই এ রকম। কিন্তু এত কাছে বুকের মধ্যে কাপণ লাগে। আমারও পাথর জীবন- একটু আশান্বিত হই। কত ফুল, পাখি।

পাথরের পাহাড়ি বুকে
হাজারো ফুলের সাজ,
পাহাড়ি জমিন মেঘছায়ায়
ভালোভাসার বৃষল শিল।
মেঘের দেশে মৃত কল্প
বাঁচায় তোমারি প্রেম \

মোবাইলের মেসেজ অপশনে টাইপ করি উপরের পঙক্তি কটি। সুমিতের কথা মনে হয়। সামিনের ডাকে মোহ ভাঙ্গে। সে হাত ধরে টেনে নেয় কাছের ব্রীজে। চারদিকে অপরূপ সৌন্দর্যের ছড়াছড়ি। মেঘ ভাসছে চারদিকে। এ অপার সৌন্দর্য দর্শনের জন্য আমাদের হাতে বেশি সময় নেই। গাড়ীতে উঠতে গিয়ে দেখি চাকা পাংচার। শপে বর হলো। আমরা আবারো নেমে পড়লাম প্রকৃতির কাছে। পেছন থেকে সাবধান বাণী- পিচ্ছিল, সাবধানে যাও। একটু এগিয়ে গেলাম, যেখানে পাহাড় আর ঝর্ণা মিতালী। একে অন্যকে ছাড়া তারা যেন অসম্পূর্ণ। আমার সুমিত আর সুমিতার কথা মনে পড়ে। পৃথিবীর হাজারো কাজের মাঝে তুমি যেমন, তেমনি আমিও তোমার কথা ভাবি-

পাথর-পাহাড়-ফুল
মানুষ-ভালোবাসা-জীবন।

আজ মিনে হয় আমি একটু বেশি আবেগতাড়িত। মেঘের ভেতর দিয়ে গাড়ী যাচ্ছে। সবাই উত্তেজিত। পথের বাক ঘেঁষে ছুটে চলেছি আমরা। এখন বৃষ্টি নেই। মনে হল এই বাঁকে এখুনি লাবণ্যকে দেখব। আমি কি অমিত? কদাচিৎ যাও লোকজন দেখা যায় সবাই শ্রমজীবি। দু’পাশে এখন পাহাড়ের সারি। ঘন অরণ্য। আমার মনে হচ্ছে-

শিলং মানে- আরণ্যক
শিলং মানে- বনে পাহাড়ে
শিলং মানে- শেষের কবিতা

আমি তোমাতে ভেসে যেতে থাকি। মেঘের সাথে ভাসতে ভাসতে মেঘদূত হয়ে যাই। বার্তা আদান-প্রদান হয়। বুঝিবা তুমিও তাই।

দেখতে দেখতে আমরা এখন চেরাপুঞ্জিতে। শহরটা বেশ সাধারণ। শহর ছেড়ে আমরা আরো সামনে এগিয়ে গেলাম। গন্তব্য মাউসমাই কেভ। জনশ্রুতি আছে এ গুহাায় ডাইনি ও অশরিরী প্রেতাত্মাদের বাস। আমরা এর ভেতরে যাব কি যাব না এ নিয়ে যখন সিদ্ধান্তহীনতায়, তখন বেøয়ার গিলসের ভাবশিষ্য সামিন উত্তেজিত এবং গুহা পরিক্রমণে অনঢ়। অগত্য সবাই ঢুকে গেলাম। ভেতরে ঢুকেই খানিকটা যেতেই দেখলাম এবড়ো তেবড়ো ও সংকীর্ণ সুরঙ্গ পথ। নিচে পানি। অনেকটা হামাগুড়ি দিয়ে, বাচ্চাদের বুকের মধ্যে জড়িয়ে কখনো চিৎকাৎ হয়ে গুহা পাড়ি দিয়ে বেরিয়ে এলাম। মনে হলো এ যাত্রায় বেঁচে গেলাম। তবে সামিন ও তার বাবার দেখা নেই। কাউসার ঘুরে এস জানালো বাপ-বেটা ছবি তুলছে অনবরথ। কষ্টসাধ্য ও স্মরণীয় গুহা দর্শন শেষ  এবার নতুন গন্তব্য “সেভেন সিস্টার্স ফলস্।” 
সেভেন সিস্টার্স ফলস মাউসমাই কেভ থেকে অনতি দূরে। এখানে একটি পাহাড়ের গা থেকে সাতটি ঝর্ণা প্রবাহিত হয়েছে। তাই সম্ভবত এ নামে ডাকা হয়। গন্তব্যে পৌঁছে দেখি একরাশ মেঘ ছাড়া কিছুই চোখে পড়ছে না। কিছুই বুঝতে পরছি না, কেবল মেঘ, মেঘ আর মেঘ। হতাশায় মনটা ভরে গেলো। কিন্তু ড্রাইভার বাপন বললো একটু অপেক্ষা করুন। চুপ করে বসে আছি, বড়জোর দশ মিনিট। অবাক করা ব্যাপার। হঠাৎ দেখি মেঘ কেটে ঝলমলে রোদ পাহাড়ের গা থেকে বেড়িয়ে এলা সাত বোন ঝর্ণা। হাজার ফুট উপর থেকে নিচে পড়ছে জলরাশি। নিচে রংধুন- রোদ, ঝর্ণা আর রংধনু এক অভূতপূর্ব সম্মিলনে এক চমৎকার দৃশ্য। আমার সুমিত আর সুমিতার কথা মনে পড়ছে। সুমিত বলেছিল- তোকে নিয়ে আমি এমন কোথাও চলে যাব, যেখানে প্রকৃতি আমাদের তার কোলে আশ্রয় দেবে। আমি তোকে বুকের ভেতর দুহাতে পাজরের সাথে মিশিয়ে রাখবো। সুমিতা প্রাণখোলা স্মিত হাসিতে বলেছিল- তবে তো তুই পাহাড় হয়ে যাবি আর আমি ঝর্ণা।  “হ্যাঁ তাই, আমি পাহাড় হব, তুই  ঝর্ণা। আমার বুকে চিরকাল তোর অবস্থান। আমাদের মিলন সুখে দু’পাশে সবুজের সমারোহ, আর মিলনকাল ঢেকে দেবে ঘন মেঘ। আমাদের মিলন আনন্দ প্রকাশ করবে- রংধনু। মানুষ উৎচ্ছসিত হবে। আমরা ভালোবাসায় সিক্ত। বল কেউ বুঝবে আমাদের?” আমি সুমিত আর সুমিতার আলাপচারিতা শুনতে পাই। এত স্পষ্ট! এত কাছে! আমি যেন ওদের অনুভব করতে পারছি। আবার মেঘ ঢেকে দিল চারপাশ। আমরা ফিরে এলাম গাড়ীর কাছে। কাছেই খাবারের রেস্টুরেন্ট, পড়ন্ত বিকেলে লাঞ্চ সেড়ে আবার শিলংয়ের পথে যাত্রা। জনমানবহীন আঁকা-বাঁকা পাহাড়,ঝর্ণা আর নাম না জানা হাজারো বন-বনানীর মাঝ দিয়ে চলা। দূরে পাহাড়। মাঝে বিস্তীর্ণ পরিত্যক্ত কিংবা অব্যবহৃত ভূমি যেখানে বনফুল তার সৌরভ ছড়িয়ে আপনি থেমে যায়। দিগন্ত বিস্তীর্ণ পাহাড়ী ফুলেল প্রান্তর আমাকে বাংলা ছায়াছবি “কেয়ামত থেকে কেয়ামত” এর কথা মনে করিয়ে দেয়। শিলং ফিরে রাতে কিছু কেনাকাটার চেষ্টা। তবে রবিবার বলে দোকানপাট প্রায় সব বন্ধ।

আজ আমাদের সফরের শেষ দিন। আজই দেশে ফিরে যাব আমরা। তবে ফিরতি পথে দেখে যাব মাওলিনং এবং লিভিং রুট ব্রিজ ও জলপ্রপাত। “ক্লিনলিনেস ইজ গডলিনেস” আমাদের সবারই জানা। তবে এর বাস্তব প্রয়োগ খুব একটা দেখা যায় না। মেঘালয়ের ছোট্ট গ্রাম মাওলিনং কিন্তু সাফল্যের সঙ্গে এরবাস্তব প্রয়োগ ঘটিয়েছে। এশিয়ার সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন গ্রামের শিরোপা অর্জন করেছে এই গ্রাম। শিলং থেকে দূরত্ব ৯০ কিলোমিটার। শিলং থেকে মাওলিনং-এর যাত্রাপথে উমতিয়াংশি নদীর কিছু পরেই পথবিভাজন। একটি পথ গেছে চেরাপুঞ্জির দিকে, অন্যটি ডাউকি। পাহাড়ের  রুক্ষতা, সবুজ উপত্যকা, পাইন বনের রোম্যান্টিকতা পথের সঙ্গী। ডাউকির পথ ধরে এগিয়ে পাংতুম থেকে আবার পথ ভাগ হয়েছে। বাম পথটি সোজা চলে গেছে ডাউকির দিকে। ডান দিকের বাকি ১৮ কিলোমিটার পথ পৌঁছে গেছে মাওলিনং। আবার ঝর্ণা, মেঘ, উচু-নীচু পথ পাড়ি দিয়ে চলছি আমরা। পথে কাশবন আর পরিচিত ফুলের সমারোহ। বাক ঘুরে একটা পথ ধরতেই প্রচন্ড তীব্র তীক্ষ্ণ একটানা শব্দ।

জীবনের অলিগলির মত এ পথ
বাঁকে বাঁকে শরীর অবসন্ন
কে জানে পথের শেষে
কি আছে?

সত্যি আমরা কি জানি, কি আছে আমাদের পথের শেষে? যাচ্ছি, যাচ্ছি। অবশেষে গাড়ী থামলো তার গন্তব্যে। সে এক মহাযজ্ঞ। মনে হলো কোন বাসস্ট্যান্ড। সারি সারি গাড়ী। আমরা নিজেরাই নিজেদের গাইড। পথ-ই দেখিয়ে দিচ্ছে পথের দিশা। এখানে দীর্ঘতম দর্শনার্থীর স্রোত। মাওলিনং-এ যাবার আগে আমরা যাব লিভিং রুট ব্রিজ ও জলপ্রপাত দেখতে। সামিন উত্তেজিত সে জিওগ্রাফী চ্যানেলে এটা দেখেছে।  লিভিং রুট ব্রিজ এক বিস্ময়কর ও আকর্ষণীয় দ্রষ্টব্য। নিবিড় অরণ্যের মাঝে প্রকৃতির অনবদ্য কারিগরি নিদর্শন এটি। এর অবস্থান থাইলং নদীর উপরে। ২৫০ মিটার নীচে সিঁড়িপথ বেয়ে আমরা পৌঁছলাম আমাদের প্রতীক্ষিত গন্তব্যে। প্রকৃতির অপার এক সৌন্দর্যের মাঝে আমরা। প্রকৃতির অনবদ্য সৃষ্টি জীবন্ত গাছের সেতুটি সত্যিই দেখার মতো। নদীর একপারে জঙ্গলের বিশাল বিশাল গাছের ঝুরি নেমে বহু বছর ধরে বেড়েছে এবং বিনুনি পাকানোর মতো শক্ত হয়ে নদীর অন্য পারে মিশেছে। দীর্ঘ দিন ধরে ঝুরির পরিমাণ বাড়তে বাড়তে সেতুর আকার ধারণ করেছে। যথাযথ যত্নও নিচ্ছে নির্ধারিত কর্তৃপক্ষ। কাউকে সেতুর মাঝে দাড়াতে দিচ্ছে না। আমি তাকিয়ে দেখছি আর অবাক হচ্ছি- পুরো দল নানান প্রশ্ন করছে। কতদিন লেগেছে? কেন এখানে এমন? বয়স কত এই সেতুর? সামিন কিছু কিছু উত্তর দিচ্ছে। ফেরার সময় হলো। আবারো সিড়ি বেয়ে উঠা। আসলেই কষ্টসাধ্য কাজ। ঘেমে নেয়ে একাকার একেকজন। তবে সবার মুখেই তৃপ্তির আনন্দ। লিভিং রুট ব্রিজের উপর দিয়ে পাড়ি দেয়ার স্মরণীয় স্মৃতি নিয়ে সবাই ফিরে যাচ্ছে পরবর্তী গন্তব্যে। 

এবার আমরা চলছি মাওলিনং দেখতে। জানা গেলো খানকার বেশিরভাগ মানুষই খাসি সম্প্রদায়ভুক্ত, খ্রিস্ট-ধর্মাবলম্বী। গ্রামে স্কুল, চার্চ সবই আছে। কমলালেবু, কাঁঠাল, আনারস, তেজপাতা, পান, সুপুরি চাষ, ফুলঝাড়– তৈরি এখানকার গ্রামের মানুষদের প্রধান জীবিকা। গ্রামের প্রতিটি বাড়ি পরিপাটি করে সাজানো। বাড়ির সামনে রয়েছে ফুলের বাগান। প্রবেশ দরজা, সীমানা বেড়া-সবই সুন্দর লতানে ফুলগাছে মোড়া। প্রতিটি বাড়ির সামনে ও রাস্তায় বেতের তৈরি ডাস্টবিন রাখা আছে। এশিয়ার সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন গ্রামের খেতাবটি ধরে রাখতে গ্রাম সমিতি ও গ্রামবাসীরা খুবই সচেষ্ট। গ্রামের প্রবেশপথেই প্রথম দ্রষ্টব্য “ব্যালান্সিং রক”। ছোট্ট এক টুকরো পাথর বিশাল এক গোলাকার প্রস্তরখণ্ডকে মাথায় নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। চোখে বিস্ময়ের ঘোর লেগে যায়। যুগ যুগ ধরে প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা অন্য কোনও কিছুই টলাতে পারেনি এই বৃহৎ প্রস্তরখণ্ড। এখানকার অন্য দর্শনীয় স্থান “স্কাই ভিউ পয়েন্ট।” প্রায় তিনতলা বাড়ির সমান উঁচুতে বাঁশ দিয়ে শক্ত করে বাঁধা মাচান। কয়েকটা বাঁশ জুড়ে তৈরি ঢাল বেয়ে বাঁশের রেলিং ধরে মাচানে উঠতে হয়। অনেকটা ওয়াচ টাওয়ারের মতো। এখান থেকে বিস্তৃত সবুজের মাঝে বাংলাদেশকে দেখা যায়। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো এশিয়ার পরিচ্ছন্নতম গ্রামে পর্যটকের ভীর এবং আমাদের সময় স্বল্পতার কারণে এর কোনোটাই আমরা ভালো করে দেখতে পারলাম না।  

এবার আমরা ছুটে চলছি আঁকা বাঁকা পথ বেয়ে বাংলাদেশ সীমান্তের দিকে। পাহাড়, ঝর্ণা আর বন-বনানী অতিক্রম করে আমরা চলছি। কিছুক্ষনের মধ্যে আমরা দেখতে পেলাম একদিকে ডাউকি নদী এবং ওপাশেই আমার প্রিয় বাংলাদেশ। মোবাইল নেটওয়ার্ক পাওয়া যাচ্ছে। সবাই কথা বলে নিচ্ছে বাংলাদেশে স্বজনদের সাথে। বিকেল সাড়ে চারটায় আমরা পৌঁছে গেলাম ডাউকি ব্রিজের কাছাকাছি। পরিচিত বাতাস ছুঁয়ে যাচ্ছে আমাদের। কিন্তু মহা বিপত্তি মহা যানজট। বড় বড় দুটি লরি এই সরু পাহাড়ি রাস্তায়। একচুল নড়ার উপায়  নেই।। এদিকে ৬টায় সীমান্ত কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাবে। সবার মধ্যে উদ্বেগ উৎকন্ঠা। অবশেষে সামিন আর তার বাবা দলের অগ্রবর্তী অংশ হিসেবে ডাউকিতে ভারতীয় ইমিগ্রেশন অফিসে চলে গেল। যানযট অতিক্রম করে সেখানে পৌঁছলাম তখন সন্ধ্য্া ৭.৩০ টা। প্রতিবেশীসুলভ ব্যবহারের জন্য ভারতীয় অফিসারদের ধন্যবাদ দিলাম। নো ম্যানস ল্যান্ডে খানিকটা দাড়ালাম। এই আকাশ-চাঁদ-চাঁদের আলো- এখানে কারো সীমানা নেই। একজন স্বাধীন মানুষ হিসেবে একটা স্বাধীন জায়গায় দাড়িয়ে আছি- হোক তা ক্ষণিকের জন্য। আমাদের ইমিগ্রেশনে দাড়িয়ে ছিল তরুণ অফিসাররা। সবাই ঢাবিয়ান। দু’দুজন স্যার আর তাদের পরিবারের সদস্যদের জন্য যতটুকু সাধ্য সবটুকুই তারা করলো। তাদের উষ্ণ আন্তরিকতাপূর্ণ অভ্যর্থনা এবং মিষ্টি ও চা দিয়ে আপ্যায়নে  সব ক্লান্তি যেন এক নিমিষেই ভুলে গেলাম আমরা। আহ স্বদেশ, আমার প্রিয় মাতৃভূমি তোমাতেই কেবল শান্তি! শান্তি!! শান্তি!!!

লেখক: সহকারী অধ্যাপক, ইউনিভার্সি ল্যাবরেটরিস্কুল এন্ড কলেজ, ঢা.বি. 

loading...

আরো খবর

    ট্যাগ নিউজ

    loading...

    সর্বশেষ খবর